নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপনকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ির বর্মাছড়িতে নাশকতার পরিকল্পনা করছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী

স্টাফ রিপোর্টার:

খাগড়াছড়ির বর্মাছড়িতে একটি নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপনকে কেন্দ্র করে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে নাশকতার পরিকল্পনা করছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা। আজ মঙ্গলবার তারা সেখানে লোকজন জড়ো করে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলেও খবর পাওয়া গেছে। তবে যেকোনো ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম প্রতিহত করতে প্রস্তুত রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।

জানা যায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর তারিখে খাগড়াছড়ির রামসু বাজার এলাকায় ইউপিডিএফ সশস্ত্র সদস্যদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে তিন জন পাহাড়ি যুবক নিহত হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম যে সকল এলাকায় সেনাবাহিনীর ক্যাম্প নাই, সে সকল এলাকায় দীর্ঘমেয়াদী অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়। অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায় যে, বিগত ২৮ সেপ্টেম্বর তারিখে ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র সদস্যরা খাগড়াছড়ির দুর্গম বর্মাছড়ি এলাকার বিভিন্ন পাড়া থেকে এসে রামসু বাজার এলাকায় সেনাবাহিনী এবং সাধারণ জনগণের উপর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দ্বারা গুলি চালায়। প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পার্বত্য অঞ্চলের অন্যান্য এলাকার ন্যায় খাগড়াছড়ির বর্মাছড়ি এলাকায় ১৮ অক্টোবর থেকে সেনাবাহিনী অভিযান পরিচালনা শুরু করে। অভিযানের অংশ হিসাবে সেনাবাহিনীর টহল দল মূল ক্যাম্প থেকে দূরবর্তী স্থানে অস্থায়ী পেট্রোল বেস স্থাপন করে বর্মাছড়ি এলাকায় ইউপিডিএফর সশস্ত্র দলসমূহকে নির্মূল করার জন্য প্রয়োজনীয় আভিযানিক কার্যক্রম শুরু করে।

বর্মাছড়িতে সেনা অভিযান চলাকালে সেনা টহল দল একটি খালি জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় অস্থায়ী পেট্রোল বেস স্থাপন করে, যা কিনা বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের খিরাম অংশের জমির অন্তর্ভুক্ত এবং বর্মাছড়ি আর্য কল্যাণ বিহার থেকে ৫০০ মিটার পশ্চিম দিকে অবস্থিত। বর্মাছড়িতে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি এবং অভিযানের কারণে ইউপিডিএফর সশস্ত্র ক্যাডাররা পাড়া থেকে দ্রুত সরে গিয়ে দুর্গম কালাপাহাড় এলাকায় এবং পার্বত্য অঞ্চলের বাহিরে ফটিকছড়ির দুর্গম অঞ্চলে অবস্থান নেয়। জানা গেছে, দীর্ঘ মেয়াদি অভিযানের কারণে খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় তারা জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে অস্থায়ী সেনা পেট্রোল বেস স্থাপনের বিরুদ্ধে চিরাচরিত কৌশল হিসেবে এলাকার জনগণ, মহিলা এবং শিশুদের জোরপূর্বক জমায়েত করে আন্দোলন শুরু করে। বনবিভাগের সংরক্ষিত জমিতে স্থাপিত অস্থায়ী পেট্রোল বেসের স্থানটিকে বর্মাছড়ি আর্য কল্যাণ বিহারের অংশ হিসেবে দাবি করে একই সাথে তারা দেশ এবং বিদেশ হতে ব্যাপক অনলাইন প্রোপাগান্ডা এবং পার্বত্য অঞ্চলে যেখানে ইউপিডিএফ এর আধিপত্য আছে এমন সব এলাকায় পোস্টার লাগিয়ে পাহাড়ি জনগণকে উত্তেজিত করে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ইউপিডিএফর নেতৃত্বে ২৪ অক্টোবর বর্মাছড়ি অস্থায়ী পেট্রোল বেসের নিকটে আনুমানিক ১০০০ জন মহিলা, শিশু ও পুরুষদের জমায়েত করে এবং সেনা সদস্যদের সাথে দুর্ব্যবহার করে। তারা বর্মাছড়িতে স্থাপিত অস্থায়ী পেট্রোল বেস আর্য কল্যাণ বিহারের অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করে এবং সেনাবাহিনী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে কিন্তু তাদের দাবির স্বপক্ষে কোন প্রকার প্রমাণাদি উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, খাগড়াছড়ির বর্মাছড়ি এলাকাটি একটি পাহাড়ি অধ্যুষিত এলাকা এবং নিকটবর্তী স্থানে কোন সেনা ক্যাম্প না থাকার কারণে ইউপিডিএফ দীর্ঘ সময় ধরে সশস্ত্র দলের ক্যাম্পসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। একই সাথে বর্মাছড়ি এলাকাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে সমতলের যোগসূত্র হবার কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশের অভ্যন্তরে ইউপিডিএফ এর অস্ত্র চোরাচালানের রুট হিসেবেও ব্যবহার হয়ে আসছে।

স্থানীয়রা বলছেন, পরিস্থিতির সামগ্রিক বিশ্লেষনে এটা সুনিশ্চিতভাবে বলা যায়, ইউপিডিএফ বিগত ২৩-৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খাগড়াছড়ি এবং রামসু বাজার এলাকায় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের আদলে পুনরায় পার্বত্য অঞ্চলকে অশান্ত করা এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠনের একটি রাষ্ট্রদ্রোহী এবং নাশকতামূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। ইউপিডিএফ’র শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ (যারা সকলে ঢাকায় এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আত্মগোপনে আছেন) খুবই পরিকল্পিতভাবে দেশের অভ্যন্তরে রাষ্ট্র বিরোধী শক্তি এবং ঘৃণার রাজনীতিকে পুঁজি করে পার্বত্য অঞ্চলকে অশান্ত করে তোলার প্রয়াসে সর্বাত্মক প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রেখেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা সুচিন্তিতভাবে মহিলা, শিশু এবং যুবক শ্রেণীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।মহিলা এবং শিশুদেরকে বিক্ষোভ এবং আন্দোলনের অংশ হিসেবে ব্যবহারের কারণে সেনাবাহিনীর মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্বকে ইউপিডিএফর সশস্ত্র ক্যাডারদের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপরিসীম ধৈর্য্য ও বিচক্ষণতা পরিদর্শন করতে হচ্ছে। সেনাবাহিনীর এই সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে ইউপিডিএফর শীর্ষ নেতৃত্ব পার্বত্য অঞ্চলকে এক অনিবার্য সংঘাতময় অঞ্চলে রূপ দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য ইউপিডিএফর সশস্ত্র ক্যাডার নিজ জাতিগোষ্ঠীর জনগণের উপর গুলি চালিয়ে হত্যা করার মত জঘন্য কার্যক্রমের দায়ভার সেনাবাহিনীর উপর চাপিয়ে সম্পূর্ণ বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকীকরণ করার জন্য প্রতিনিয়ত অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।সার্বিক বিষয়টিকে পরিষ্কার করার জন্য সোমবার বেসামরিক প্রশাসনের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ, সেনাবাহিনীর মাঠ পর্যায়ের কমান্ডার সমূহ এবং মিডিয়ার উপস্থিতিতে এলাকাবাসীর নিকট তাদের দাবির স্বপক্ষের প্রমাণাদি দাখিলের আহবান করা হলে তারা তা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। ইউপিডিএফ এর মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে দাবিকৃত অস্থায়ী সেনা পেট্রোল বেস বনবিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমির উপর স্থাপন করা হয়েছে, সেনাবাহিনী সামগ্রিক বিষয়টি অনুধাবন করে অত্যন্ত ধৈর্য্য এবং পেশাদারিত্বের সাথে প্রতিটি ঘটনা মোকাবেলা করে যাচ্ছে। তবে ইউপিডিএফ এবং অঙ্গসংগঠন কর্তৃক পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা কোন বিচ্ছিন্ন সাময়িক প্রচেষ্টা নয়, বরং অত্র অঞ্চলের উদীয়মান ভূ-রাজনীতির অপকৌশলমাত্র বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করে। এই রাজনৈতিক অপকৌশল ও সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি সংস্থার সমন্বিত এবং দ্রুত পদক্ষেপই একমাত্র বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা রক্ষা করতে পারে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় একটি অবশ্যম্ভাবী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এড়াতে সেনাবাহিনী বর্মাছড়িতে স্থাপিত অস্থায়ী পেট্রোল বেস অন্যত্র স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং পার্বত্য অঞ্চলে আরো কঠোর সেনা অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে। পার্বত্য অঞ্চলে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর অফিসার ও সৈনিকরা ইউপিডিএফসহ সকল রাষ্ট্র বিরোধী সংগঠনের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে মাতৃভূমির অখন্ডতা রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব দৃঢ়তার সাথে পালন করতে দেশবাসীর নিকট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি শেয়ার করুন